ডেঙ্গু জ্বর (Dengue) থেকে রক্ষায় অবশ্যই হোমিওপ্যাথি

45

ডেঙ্গু জ্বর বর্তমানে বাংলাদেশে আতঙ্কের নাম। রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ অতীতে যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। ডেঙ্গুজ্বর ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতি। মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ভাইরাস। আর এই ভাইরাসের বাহক হলো এডিস মশা।

কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার একাংশে এবার ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ প্রায় মহামারির পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রচলিত ধরনের সঙ্গে শক সিনড্রোম দেখা দেওয়ায় ঝুঁকি ও মৃত্যুহারও বেড়েছে। ডেঙ্গু জ্বর রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন- ভারত,শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এটি বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এডিসবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এ দেশের চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রোগের চিকিৎসা দিতে সেবার হিমশিম অবস্থা হয়েছিল। সে বছর মৃতের সংখ্যাও প্রায় শত ছুঁয়েছিল।

পরের বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সংখ্যা অনেক কমে আসে। ২০১৫ সালের পর ডেঙ্গু আবার বাড়তে থাকে। সে বছর আক্রান্ত হন ২৬৭৭ জন। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বাড়ে।

ডেঙ্গুজ্বরের (Dengue) কারণ

ডেঙ্গু জ্বর মূলত এডিস এজিপ্টি (Aedes aegypti) মশার কামড়ে হয়। তবে সব এডিস মশার কামড়ে এ জ্বর হয় না। এই মশা তখনই ক্ষতিকর হবে যখন এই মশা ডেঙ্গু জ্বরে সংক্রমিত কোনো ব্যক্তিকে কামড় দেবে। ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস তখন এই মশা বহন করবে এবং এই মশা যখন কোনো সুস্থ মানুষকে কামড় দেবে তখন ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন।

ডেঙ্গুজ্বরের (Dengue) সাধারন লক্ষণ

সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর, ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেবার পর আবারো জ্বর আসতে পারে। এর সাথে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চেখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‍্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরের শক সিনড্রোম

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সাথে সার্কুলেটরী ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম তৈরি হয়। এর লক্ষণ হলো-

-রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।

-নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হওয়া।

-শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া।

-প্রস্রাব কমে যাওয়া।

-হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

-প্ল্যাটিলেট কাউন্ট অনেক কমে যাওয়া।

-শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়, যেমন চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে, মাড়ি ও দাঁত হতে, কফের সঙ্গে, রক্তবমি, পায়খানার সাথে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, মহিলাদের বেলায় অসময়ে ঋতুস্রাব অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেকদিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে থাকা ইত্যাদি।

ডেঙ্গুজ্বর (Dengue) নির্নয়

রোগীর ইতিহাস আমরা খুব সুন্দর করে নিই। জ্বরটা কতদিন ধরে এলো। জ্বরটা কতটুকু হলো- এসব বিষয়ে জানি। জিজ্ঞেস করি তার র‍্যাশটা কীভাবে এলো। এরপর আমরা রক্ত পরীক্ষা করি। রক্ত পরীক্ষা করে আমরা বুঝতে পারি। কারণ, WBC test এ প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায়। আর খুব দ্রুত বোঝা যাবে, এর জন্য একটি পরীক্ষা রয়েছে। সেটি হলো NS1, এটি একদিনের মধ্যেই করা যায়। পাঁচদিনের মধ্যে এই NS1 পজিটিভ হয়ে যায়।

কখন ডাক্তার দেখাবেন-

ডেঙ্গুজ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই ভালো। তা হল-

-শরীরের যে কোন অংশ থেকে রক্তপাত হলে।

-প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে।

-শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি আসলে।

-প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে।

-জন্ডিস দেখা দিলে।

-অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে।

-প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে।

ডেঙ্গুজ্বরে করনিয়

  • বিশ্রামে থাকতে হবে- জ্বর হলে বিশ্রামে থাকতে হবে। জ্বর নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা উচিত নয়। একজন ব্যক্তি সাধারণত প্রতিদিন যেসব পরিশ্রমের কাজ করে, সেগুলো না করাই ভালো। পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন।
  • খাওয়া-দাওয়া- প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন- ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

ডেঙ্গুজ্বরের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

বাংলাদেশের মানুষ যদি ডেঙ্গুতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিত, তবে এত ব্যপক প্রানহানী ঘটতো না। এজন্য হোমিওপ্যাথির ব্যপক প্রচারনা প্রয়োজন। যাই হোক নিচে কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধের আলোচনা করলাম-

  • ইউপেটোরিয়াম পার্ফোলিয়েটামঃ অনেকে রুটিনলি চালায় বা চালাচছে। কিন্তু, যে লক্ষনটি না থাকলে শুধু ডেঙ্গু কেন, কোন রোগেই এই ঔষধটি দেওয়ার কথা ভাবা যায় না, সেই এক এবং অনন্য রেড লাইন মার্ক করা লক্ষনটি হল- সারা গা হাত পায়ে অসহ্য ব্যথা, ব্যথা মাংসপেশীতে নয়, হাড়ের মধ্যে, যেন সারা শরীরের হাড়গোড় সব ভেঙে গেছে, যেন কেউ লাঠি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হাড়গোড় সব ভেঙে দিয়েছে। ব্যথা বিশেষ করে– চোখের মধ্যে, বাহুতে, রিষ্ট জয়েন্টে, পায়ের কাফ মাসেলে, পিঠে, এবং মাথার পিছনে।
  • আর্সেনিক এ্যালবাঃ অসম্ভব দূর্বলতা, ভীত, সন্ত্রস্ত, মৃত্যুভয়, মানসিক উদ্বেগ ও অস্থিরতা, বারবার জল চায়, কিন্তু খেতে পারে না বেশী, পায়খানা পাতলা কালো, দূর্গন্ধ, শরীরে ভীষণ শীত শীত ভাব, কাপড় চোপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছা, শরীরে জ্বালাপোড়া, রাত বা দিন, ১২ টা থেকে ২ টার মধ্যেই জ্বর বা অন্য যে কোন কষ্ট বাড়ে।
  • ক্রোটেলাস হরিডাসঃ দূর্বলতা, জন্ডিসের মতন শরীরের চামড়া হলদেটে হয়ে যায়, শরীরের যে কোন দ্বার দিয়ে রক্তস্রাব হতে আরম্ভ করে, বিশেষ করে কাল রংয়ের রক্তস্রাব, সকল স্রাবে দূর্গন্ধ, জিভ উজ্জ্বল লাল, শরীরের ডানদিক বেশী আক্রান্ত হয়, শরীর গরম নয়, ঠান্ডা থাকে।
  • জেলসিমিয়ামঃ অত্যন্ত দূর্বল, বিছানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে, চোখ খুলতে চায় না, ঘুমিয়ে থাকে বা সর্বদা ঘুম ঘুম ভাব, হাত পা বরফের মত ঠান্ডা, কিন্তু মাথার তালু গরম থাকে, হাত, পা, জিভ, বা সারা শরীর কাঁপতে থাকে, বা মৃদু কম্পন অনুভূত হয়, সব সময় শীত শীত ভাব, তাই আবৃত থাকতে চায়, জল পিপাসা থাকে না, তীব্র মাথা ব্যাথা থাকে, সারা শরীরেও ভীষণ কামড়ানো ব্যথা।
  • পাইরোজেনঃ জ্বর ১০৩, ১০৪, ১০৫ ডিগ্রী, সব সময় এমন হাইফিভার চলতে থাকে, কিন্তু শরীরের উত্তাপের তুলনায় পালস বা নাড়ীর গতি অনেক বেশী থাকে, জিভ টকটকে লাল ও মসৃণ থাকে, কিম্বা অগ্রভাগ লাল এবং বাকীটা সাদা কোটেড থাকে, গা হাত পায়ে অসহ্য ব্যথার জন্য বিছানা ভীষণ শক্ত মনে হয়, কাছে লোক পেলে কথা বলতে চায়, বকবক করতে চায়, শরীরের সকল স্রাব অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত।

এই সব ঔষধ ছাড়াও ব্রায়োনিয়া, রাস টক্স, ব্যাপটিসিয়া, ফসফরাস, চায়না, নাকস-ভোম, পালস, বেলেডোনা, এপিস, নেট্রাম মিউর, ইত্যাদি ঔষধও লক্ষণ ভিত্তিক খুবই ভালো কাজ করে।


আরও পড়ুন