নিরাপদ প্রসব (Safe Delivery) ও গর্ভকালীন হোমিও চর্চা

27

আজ জানাব নিরাপদ প্রসব (Safe Delivery) ও গর্ভকালীন হোমিও চর্চা নিয়ে। বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিতে গর্ভবতীদেরকে বেশি পরিমানে ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, আয়রণ, ফলিক এসিড ইত্যাদি খাওয়ানো হয় ।

কারণ তারা এগুলোকে গর্ভবতীদের জন্য নিরাপদ মনে করে থাকেন। কিন্তু এ  সমস্ত ঔষধই অনেকবেশি ক্ষতিকর সাইড-ইফেক্টযুক্ত । তবে এসব ঔষধের কারণে গর্ভবতী ও গর্ভস্থ শিশুর কি কি ক্ষতি হয়, তা জানার কোন উপায় নেই। কারণ

১.  প্রথমত বড় বড় ঔষধ কোম্পানীগুলো সাধারণত তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে ঔষধের ক্ষতিকর দিকটি প্রকাশ করে না।

২. দ্বিতীয়ত তাদের এসব ঔষধ যেহেতু ইদুঁর-বাদর-খরগোস-গিনিপিগের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবিষ্কার করা হয়।

কাজেই কোন ঔষধ ইদুঁর-বাদর-খরগোস-গিনিপিগের ক্ষতি করে না বলে মানুষেরও ক্ষতি করবে না- এমনটা বলা যাবে না। আমরা সকলেই একটু  একটু জানি যে,  ক্যালশিয়াম খাওয়া কিডনীতে পাথর (Renal calculus) হওয়ার  একটি মূল কারণ।

ইদানীং চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে, বেশী মাত্রায় আয়রণ খাওয়া মহিলাদের স্তন ক্যানসারের একটি বড় কারণ।

ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, আয়রণ ইত্যাদি আমাদের দৈনন্দিন খাবারেই  যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, কাজেই ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ইত্যাদি ঔষধ বেশি পরিমানে খেলে শরীরে এসব প্রাকৃতিক উপাদানের ভারসাম্যহীনতা (imbalance) সৃষ্ঠি হওয়াই স্বাভাবিক।

আর  এসব ভারসাম্যহীনতার কারণেই সম্ভবত গর্ভবতী মায়েদের পেটের পানির (placenta fluid) পরিমাণ কমে যায়,  এবং সঠিকভাবে প্রসব ব্যথা উঠতে চায় না। ফলে সিজারিয়ান অপারেশনের (Cesarean operation) সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। আর  যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়, তাহলো এতে অধিকাংশ মহিলাই ভীষণ রকমে মোটা (obese) হয়ে যান।

আর মোটা মানুষরা ক্যানসার, হৃদরোগ (heart disease), হাঁপানী, ডায়াবেটিস,  উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট এটাক, জয়েন্টে ব্যথা (Arthritis) ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয় বেশী হারে।

হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গর্ভকালীন সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে কোন (ভিটামিন, আয়রণ, ক্যালশিয়াম জাতীয়) ঔষধ খাওয়ানোর পক্ষে কম অগ্রসর। বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি ভালো আছে এবং মাছ-গোশত-শাক-সবজি-ফল-মূল ইত্যাদি কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ আছে, তাদের আলাদা ভাবে কোন (ভিটামিন জাতীয়) ঔষধ খাওয়ার প্রয়োজন নাই।

তবে যে-সব গর্ভবতী মায়েরা শরীরিক-মানসিক দুর্বলতা, রক্তশূণ্যতা তে ভোগে, অথবা যারা অভাব-অনটনের কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্ঠিকর খাবার-দাবার কিনে খেতে পারে না কিংবা যারা পুষ্ঠিকর খাবার কিনে খেতে পারলেও শারীরিক ত্রুটির কারণে সেগুলো যথাযথভাবে শরীরে শোষিত (absorption) হয় না, তাদেরকে ক্যালকেরিয়া ফস (Calcarea  phos), ফেরাম ফস (Ferrum  phos), ক্যালি ফস (Kali  phos), লিসিথিন (Lecithinum) ইত্যাদি হোমিও ভিটামিন / টনিক জাতীয় ঔষধগুলো নিম্নশক্তিতে (6X) অল্প মাত্রায় খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এই ঔষধগুলি মানব শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ক্যালশিয়াম, আয়রণ, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস সরবরাহ করে থাকে। পাশাপাশি এই ঔষধগুলো আমাদের শরীরকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে আমাদের শরীর নিজেই তার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্ঠিকর উপাদানগুলো আমাদের দৈনন্দিন খাবার থেকে শোষণ/ গ্রহন করার যোগ্যতা লাভ করে।

গর্ভকালীন সময়ে খেলে এই ঔষধগুলো আপনার গভর্স্থ সন্তানের হাড় (bone), দাঁত (teeth), নাক (nose), চোখ (eye), মস্তিষ্ক (brain) ইত্যাদির গঠন খুব ভালো এবং নিখুঁত করতে সাহায্য করবে এবং আপনার সন্তান ঠোট কাটা (harelip), তালু কাটা (cleft palate),  হাড় বাঁকা (rickets), খোঁজা (epicene), বামন (dwarfish), পিঠ বাঁকা (Spina bifida), বুদ্ধি প্রতিবন্ধি (autism), হৃদরোগ, চর্মরোগ, কিডনীরোগ  প্রভৃতি দোষ নিয়ে জন্মনোর হাত থেকে রক্ষা পাবে।

নিরাপদ প্রসব : যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখবেন

যাদের বংশে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্দ্বি শিশু জন্মের ইতিহাস আছে, তাদের গর্ভকালীন সময় এই ঔষধগুলো অবশ্যই খাওয়া উচিত।

ভিটামিন জাতীয় এই হোমিও ঔষধগুলো গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যের এত চমৎকার যত্ন নেয় যে, এগুলো বেশ কয়েক মাস খেলে তাদের উচ্চ রক্তচাপ (hypertension), হাঁপানী (asthma), ডায়াবেটিস(diabetes), মাথাব্যথা, বমিবমিভাব, ছোটখাট জ্বর-কাশি, খিচুঁনি (eclampsia) ইত্যাদি রোগ আপনা আপনি ভালো হয়ে  যায়।

অন্যদিকে যাদের উচ্চ রক্তচাপ,  হাঁপানী, ডায়াবেটিস, খিচুঁনি, ধনুষ্টংকার ইত্যাদি রোগ নাই, তারাও এই ঔষধ ৪টি খাওয়ার মাধ্যমে সে-সব রোগে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পারবেন।

ঔষধ চারটি একসাথে খাওয়া উচিত নয় ; বরং একটি একটি করে খাওয়া উচিত। যেমন-

১. ক্যালকেরিয়া ফস সাত দিন

২.  ফেরাম ফস সাত দিন

৩.  ক্যালি ফস সাত দিন

৪.  লিসিথিন সাতদিন

এইভাবে চক্রাকারে একটির পর একটি করে খান। সাধারণত 1X, 3X, 6X, 12X ইত্যাদি নিম্নশক্তিতে খাওয়া উচিত ; যেটি মার্কেটে পাওয়া যায়। ৫ টি বড়ি করে সকাল-বিকাল রোজ দুইবার(২+০+২) করে খান।

প্রয়োজন মনে করলে গর্ভকালীন পুরো ৯ মাসই খেতে পারেন এবং সন্তানকে স্তন্যদানকালীন দুই বছরও খেতে পারেন। তবে মাঝে মধ্যে সাতদিন বা পনের দিন মধ্যবর্তী বিরতি দিয়ে খাওয়াও একটি ভালো রীতি।

সহজ, আরামদায়ক এবং সিজারিয়ানমুক্ত ডেলিভারির জন্য কলোফাইলাম (Caulophyllum thalictroides)  ঔষধটি (৩, ৬, 12 ইত্যাদি নিম্নশক্তিতে) প্রসবের  দুইমাস পূর্ব (অর্থাৎ‍ সাত  মাস) থেকে (৫ বড়ি করে) রোজ একবার করে খেয়ে যান।  এটি গর্ভ রক্ষার অর্থাৎ গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষার একটি শ্রেষ্ট ঔষধ।

এটি গর্ভস্থ শিশুর চারদিকে পানির (placenta  fluid) পরিমাণ সঠিক মাত্রায় বজায় রাখে এবং পানির পরিমাণ কমতে দেয় না, ফলে অধিকাংশ শিশু সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক পথে (vaginal route)  জন্ম নিয়ে থাকে।

এমনকি যাদের কোমরের বা তলপেটের (pelvic cavity) গঠন ভালো নয় বলে ডাক্তাররা সিজার করতে বলে, তাদেরও শিশু এবং মায়ের কোন ক্ষতি ছাড়াই নরমাল ডেলিভারি হয়ে যায়।

তাছাড়া অতীতে যাদের সিজার হয়েছে, তারাও কলোফাইলাম খেয়ে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, নিজের এবং শিশুর কোন ক্ষতি ছাড়াই।

কলোফাইলাম গর্ভপাত (abortion) রোধের একটি উত্তম ঔষধ, যাতে ভুয়া প্রসব ব্যথা দেখা দিলে এটি প্রয়োগ করতে হয়। যাদের প্রতিবারই (তৃতীয় মাস, পঞ্চম মাস ইত্যাদি) একটি নির্দিষ্ট সময়ে গর্ভ নষ্ট হয়ে যায়, তারা সেই নির্দিষ্ট সময়ের একমাস পূর্ব থেকেই অগ্রিম এই ঔষধটি খাওয়া শুরু করতে পারেন ।

ডেলিভারির জন্য উৎকৃষ্ট ওষুধ হলো পালসেটিলা (Pulsatilla pratensis) যদি ডেলিভারি ডেট অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ব্যথা না ওঠে অথবা প্রসবব্যথা কম ওঠে অথবা ব্যথা একবার  আসে আবার চলে যায়, তবে পালসেটিলা (Pulsatilla pratensis) হোমিও ঔষধটি আধা ঘণ্টা পরপর খাওয়াতে থাকুন। এটি প্রসব ব্যথাকে বাড়িয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি প্রসব কাজ সমাধা করার ব্যাপারে একটি শ্রেষ্ঠ ঔষধ।

এমনকি ডাক্তাররা যদি সিজারিয়ান অপারেশান করার জন্য ছুড়িতে ধার দিতে থাকে, তখনও আপনি পালসেটিলা খাওয়াতে থাকুন। দেখবেন ছুড়ি ধার হওয়ার পূবেই বাচ্চা নরমাল ডেলিভারি হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, সন্তানের পজিশন যদি ঠিক না থাকে, তবে পালসেটিলা তাও ঠিক করতে পারে।

আরও কিছু টিপস

শিশুর মাথা যদি উপরের দিকে অথবা ডানে-বামে ঘুরে থাকে, তবে দুয়েক মাত্রা পালসেটিলা খাওয়ালেই দেখবেন শিশুর মাথা ঘুরিয়ে অটোমেটিকভাবে নীচের দিকে নিয়ে এসেছে।

১. ক্যালকেরিয়া ফস (Calcarea phos), ফেরাম ফস (Ferrum phos), ক্যালি ফস (Kali phos), লিসিথিন (Lecithinum) ঔষধ চারটি একসাথে খাওয়া উচিত নয় ; বরং একটি একটি করে খাওয়া উচিত। যেমন- ক্যালকেরিয়া ফস সাত দিন, তারপর ফেরাম ফস সাত দিন, তারপর ক্যালি ফস সাত দিন, তারপর লিসিথিন সাতদিন – এইভাবে চক্রাকারে একটির পর একটি করে খান। সাধারণত 1X, 3X, 6X, 12X ইত্যাদি নিম্নশক্তিতে খাওয়া উচিত ; ৫ টি বড়ি করে সকাল-বিকাল রোজ দুইবার করে|

প্রশ্ন : উপরোক্ত মেডিসিন পোটেন্সি  নাকি বায়োকেমিক ? উত্তরঃ  বায়োক্যামিক। আর পোটেন্সি হলে ১ ড্রাম গ্লোবিউলস এ অরিজিনাল জার্মানী ওষুধ ৫ ফোটা দিতে হবে।

২.  ডেলিভারির জন্য খাওয়াবেন পালসেটিলা (Pulsatilla pratensis) নামক ঔষধটি। যদি ডেলিভারি ডেট অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ব্যথা না ওঠে অথবা প্রসবব্যথা কম ওঠে অথবা ব্যথা একবার আসে আবার চলে যায়, তবে পালসেটিলা (Pulsatilla pratensis) নামক হোমিও ঔষধটি আধা ঘণ্টা পরপর খাওয়াতে থাকুন।

প্রশ্ন : উপরোক্ত মেডিসিন অরিজিনাল ওষুধ খাওয়াব, নাকি গ্লোবিউলসএ এবং কতটুকু খাওয়াব ?

উত্তরঃ  অরিজিনাল লিকুইড ঔষধ খাওয়াতে পারেন, চিনির বড়িতেও খাওয়াতে  পারেন। আবার অরিজিনাল এবং চিনির বড়িতে আনা ঔষধ বিশুদ্ধ পানির সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।

৩. Pulsatilla pratensis : মাসিক বন্ধের চিকিৎসায় হোমিও ঔষধগুলোর মধ্যে পালসেটিলার স্থান এক নম্বরে। এটি স্নেহপরায়ন, কথায় কথায় কেদে ফেলে, খুব সহজেই মোটা হয়ে যায়….এই ধরণের মেয়েদের বেলায় ভালো কাজ করে। মাত্রা হবে নিম্নশক্তিতে (Q, ৩, ৬ ইত্যাদি) ৫ থেকে ১০ ফোটা করে রোজ তিনবার।

প্রশ্ন : উপরোক্ত মেডিসিন এর তিনটি শক্তির যে কোন শক্তি কি অরিজিনাল ওষুধ খাওয়াব ?

উত্তরঃ  অরিজিনাল ঔষধ খাওয়ানোই ভালো হবে। তবে যাদের পেটে বাচ্চা আসার কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তারা যদি না জেনেও পালসেটিলা বা অন্যকোন মাসিক চালু করার ঔষধ খান, তাতে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ।


আলট্রাসনোগ্রামে  যদি  দেখেন  যে  বাচ্চার  ওজন  চার  কেজি  হয়ে  গেছে,  তবে  প্রেসক্রিপশানের  ঔষধগুলো  খাওয়া  বন্ধ  করে  দিবেন ।  কেননা  বাচ্চা  বেশী  বড়  হয়ে  গেলে  প্রসবে  সময়  অনেক  সমস্যা  হতে  পারে ।


 

আরও পড়ুন