গর্ভকালীন হোমিও পরিচর্যা ও নিরাপদ প্রসব

গর্ভকালীন হোমিও পরিচর্যা ও নিরাপদ প্রসব । গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে মা কে এন্টিসোরিক ওষুধ সেবন করালে ভালো। এ সময় শক্তিকৃত সালফার প্রয়োগের জন্য বলা হয় যাতে গর্ভস্থ সন্তান সোরা মুক্ত হতে পারে (সোরা হচ্ছে অধিকাংশ ক্রনিক রোগের প্রধান কারণ যা উত্তরাধিকার সূত্রে সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়) এভাবে জন্ম সময় থেকেই সন্তানকে সোরার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে সে সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারবে।

গর্ভবতী মাকে প্রথম পর্যায়ে সালফার দিয়েই চিকিৎসা শুরু করতে হবে। কিন্তু লক্ষণ অনুযায়ী অন্যান্য ওষুধ ও সময় মতো দিতে হবে। এভাবে পূর্ণ গর্ভকালীন সময়টা একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা দেয়া যায়।
সুতরাং গর্ভকালীন সময়ে এন্টিসোরিক ওষুধ দেয়াটা অত্তান্ত জরুরি। কারণ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় গর্ভকালীন সময় ক্রনিক লক্ষণগুলো বেশ চমৎকার ভাবেই ফুটে ওঠে। এ সময় স্ত্রীলোকদের শরীর থাকে খুব সংবেদনশীল। তাই এ সময় এন্টিসোরিক ওষুধগুলো খুব কার্যকরী এবং লক্ষণ সামগ্রিকতার ভিক্তিতে উচ্চতর শক্তির ওষুধ ক্ষুদ্রতম মাত্রায় প্রয়োগ করলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়।

প্রাথমিক পর্যায় গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের আশংকা থাকলে কিংবা বার বার গর্ভপাত এর ইতিহাস থাকলে সঠিক এন্টিসোরিক দিয়ে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষভাবে মায়ের রক্তের “রিসাস ফ্যাক্টর ” নেগেটিভ হলে সাধারণভাবে প্রথম বাচ্চার জন্ম সফল হলেও পরবর্তী গর্ভপাত হোৱৰ আশংকা থাকে। এমনকি জন্মের পর শিশুর জীবনের ও আশংকা থাকে।

গর্ভস্থ শিশুর অবস্থা ও গর্ভবতী মায়ের বিভিন্ন জটিলতার অজুহাতে আজকাল সিজারিয়ান ঘটনা নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব ক্ষেত্রে সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ শিশুর অবস্থান ঠিক করে নিরাপদ প্রসবের নিশ্চয়তা দেয়।

এলোপ্যাথিতে কি হয় আসলে, মহিলারা গর্ভধারণ করলেই গাইনী ডাক্তার তাদের প্রসব, পায়খানা, রক্ত, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এমআরআই, সিটিস্ক্যান ইত্যাদি ইত্যাদি এক বস্তা টেস্ট করতে দেন। তারপর একটা লম্বা লিস্ট ওষুধ, ইনজেকশন/ভ্যাকসিন মাসের পর মাস খেতে থাকে।

এমন সময় ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ইত্যাদি প্রচুর পরিমানে খাওয়ানো হয়। যেহেতু তারা এগুলোকে গর্ভবতীদের জন্য নিরাপদ মনে করে থাকেন। তবে এসব ওষুধের কারণে মা ও শিশুর কি কি ক্ষতি হয় তা জানার উপায় নেই কারণ, বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যাবসায়িক স্বার্থের কারণে ওষুধের ক্ষতিকর দিক প্রকাশ করে না।

তাদের এইসব ওষুধ ইঁদুর-বাদর-খরগোশ-গিনিপিগ এর উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আবিষ্কার করা হয়। কাজেই কোনো ওষুধ ইঁদুর-বাদর-খরগোশ-গিনিপিগ এর ক্ষতি করেন বলেই যে মানুষের ক্ষতি হবেনা এমনটা বলা যাবেনা। তাছাড়া অত্যাধিক ক্যালসিয়াম খাওয়া যে কিডনি তে পাথর (Renal Calculas) হওয়ার একটি মূল কারণ এটা আমরা অনেকেই জানি। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে বেশি মাত্রায় আয়রন খাওয়া মহিলাদের স্তন ক্যান্সার এর একটা বড় কারণ। তাছাড়া অধিকাংশ মহিলায় ভীষণ রকমের মোটা (Obese) হয়ে যান। সাধারণত মোটা মানুষের ক্যান্সার, হৃদরোগ, হাঁপানি, ডায়াবেটিস,উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট এটাক, জয়েন্ট এ ব্যাথা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয় বেশি।

বিশেষত যাদের হজম শক্তি ভালো আছে মাছ-মাংস-শাক-সবজি-ফল-মূল ইত্যাদি কিনে খাবা রমতো সামর্থ আছে তাদের ভিটামিন জাতীয় কোনো ওষুধ খাবার প্রয়োজন নেই। তবে যেসব মায়েরা শারীরিক-মানুসিক দুর্বলতা, রক্তশুন্যতা ইত্যাদি তে ভোগেন, অথবা যারা আর্থিক অসংগতির কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কিনে খেতে পারেননা কিংবা যারা কিনে খেতে পারলেও শারীরিক ত্রুটির কারণে সেগুলো যথাযথভাবে শরীরে শোষিত (absorption) হয় না তাদেরকে ক্যালকেরিয়া ফোস (calcerea phos ), ফেরাম ফস (ferum phos ), কালি ফস (Kali phos ), লিসিথিন (Lecithinum ) ইত্যাদি হোমিও ভিটামিন/টনিক জাতীয় ওষুধগুলো নিম্ন শক্তিতে (৬x) অল্প মাত্রায় খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এই ওষুধগুলো মানব শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম , আয়রন, পটাসিয়াম, ফসফরাস, সরবরাহ করে থাকে। পাশাপাশি এইসব ওষুধ গুলো আমাদের শরীরকে এমনভাবে গড়ে তোলে যে আমাদের শরীর নিজে থেকেই তার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর উপাদানগুলি আমাদের দৈন্যন্দিন খাবার থেকে শোষণ করার /গ্রহণ করার যোগ্যতা লাভ করে।
গর্ভকালীন সময়ে খেলে এই ওষুধ গুলো আপনার গর্ভস্থ সন্তানের হাড় (bone), দাঁত (teeth), নাক (nose), চোখ (eye), মস্তিস্ক (brain), ইত্যাদির ঘটনা খুব ভালো এবং নিখুঁত করতে সাহায্য করবে এবং আপনার সন্তান ঠোঁট কাটা (harelip), তালু কাটা, হাড় বাঁকা (rickets), খোঁজা(epicene), বামন (dwarfish), পিঠ বাঁকা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী (autism), হৃদরোগ, চর্মরোগ,কিডনীরোগ, প্রভিতি দোষ নিয়ে জন্মানোর হাত থেকে রক্ষা পাবে।

এই জন্য যাদের বংশে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের ইতিহাস আছে তাদের গর্ভকালীন সময় এই ওষুধগুলো অবসসই খাওয়া উচিত।
ভিটামিন জাতীয় এই হোমিও ওষুধগুলো মায়ের স্বাস্থ্যের এতো চমৎকার যত্ন নেয় যে এগুলো বেশ কয়েকমাস খেলে তাদের উচ্চ রক্তচাপ (hypertension), হাঁপানি (asthma), ডায়াবেটিস (diabetes), মাথা ব্যাথা, বমিবমি ভাব,ছোটোখাটো জ্বর-কাশি, খিঁচুনি (eclampsia), ধনুষ্টঙ্কার ইত্যাদি রোগ নাই তারাও এই ৩ টি ওষুধ সেবনের মাদ্ধমে সে-সব রোগে আক্ৰান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পারবেন।

ক্যালকেরিয়া ফোস (calcerea phos ), ফেরাম ফস (ferum phos ), কালি ফস (Kali phos ), লিসিথিন (Lecithinum ) ইত্যাদি ওষুধ ৪ টি একসাথে খাওয়া উচিত নয়, বরং ১ টি , ১ টি করে খাওয়া উচিত। যেমন ক্যালকেরিয়া ফস ৭ দিন, তারপর ফেরাম ফস ৭ দিন , তারপর কালি ফস ৭ দিন , তারপর লিসিথিন ৭ দিন এইভাবে চক্রাকারে একটির পর একটি করে খাওয়ান। সাধারণত ১x, ৩x, ৬x, ১২x ইত্যাদি নিম্নশক্তিতে খাওয়া উচিত। ৫ টি বড়ি সকাল-বিকাল রোজ ২ বার করে খান। এটা বায়োকেমিক খাওয়া যায় আবার যদি হোমিও হয় তাহলে ১ ড্রাম গ্লোবিউলস এ অরিজিনাল জার্মানি ৫ ফোটা দিতে হবে।

প্রয়োজন মনে করলে পুরো ১০ মাস খেতে পারেন এবং সন্তানকে স্তন্যদানকালীন ২ বছর ও খেতে পারেন। তবে মাঝে মধ্যে ৭ দিন বা ১৫ দিন মধ্যেবর্তী বিরতি দিয়ে খাওয়া ও একটা ভালো রীতি।

সহজ আরামদায়ক সিজারিয়ানমুক্ত ডেলিভারির জন্য কোলোফাইলাম (chlorophyllum) ওষুধ টি (৩,৬,১২ ইত্যাদি নিম্ন শক্তিতে ) প্রসবের ২ ই মাস পূর্ব (অর্থাৎ ৮ মাস ) থেকে ৫ বড়ি করে রোজ ১ বার খেয়ে যান। এটি গর্ভ রক্ষার অর্থাৎ গর্ভস্থ সিহুকে রক্ষার একটি শ্রেষ্ট ওষুধ।
এটি গর্ভস্থ শিশুর চারদিকে পানির পরিমান সঠিক মাত্রায় বজায় রাখে এবং পানির পরিমান কমতে দেয়না , ফলে অধিকাংশ শিশু সিজারিয়ান অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক ভাবে জন্ম নিয়ে থাকে।

এমনকি যাদের কোমরের বা তলপেটের গঠন ভালো নয় বলে ডাক্তাররা সিজার করতে বলে তাদের দেখেছি শিশু এবং মায়ের কোনো ক্ষতি ছাড়াই নরমাল ডেলিভারি হয়ে যায়।

তাছাড়া যাদের অতীতে সিজার হয়েছে তারাও কোলোফাইলাম খেয়ে নরমাল ডেলিভারি এর মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে পারেন নিজের ও শিশুর ক্ষতি ছাড়াই।

কোলোফাইলাম গর্ভপাতের একটি উত্তম ওষুধ, যাতে ভুয়া প্রসব ব্যাথা দেখা দিলে এটি প্রয়োগ করতে হয়। যাদের প্রতিবারই ( ৩, ৫ মাস ইত্যাদি ) একটি নির্দিষ্ট সময় গর্ভ নষ্ট হয়ে যায় তারা সেই নির্দিষ্ট সময়ের একমাস পূর্ব থেকেই অগ্রিম এই ওষুধটি খাওয়া শুরু করতে পারেন।

অন্যদিকে ডেলিভারির জন্য খাওয়াবেন পালসেটিলা ওষুধ। যদি ডেলিভারির ডেট অতিক্রম করার পরেও ব্যাথা না ওঠে অথবা কম ওঠে অথবা ব্যাথা একবার আসে আবার চলে যায়, তবে পালসেটিলা ওষুধ আধা ঘন্টা পর পর খাওয়াতে থাকুন। এটি প্রসব ব্যাথা বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি ডেলিভারি হতে সহজ করে।

এমনকি ডাক্তাররা যদি সিজারিয়ান অপারেশন করার জন্য চুরিতে ধার দিতে থাকে তখন আপনি পালসেটিলা খাওয়াতে থাকুন। চুরি ধার হবার আগেই দেখবেন নরমাল ডেলিভারি হয়ে গেছে। মনে রাখবেন নরমাল ডেলিভারি এর কষ্ট থাকে ২/১ দিন কিন্তু সিজারিয়ান সারাজীবন।

শুধু তাই নয়, সন্তানের পজিশন যদি ঠিক না থাকে তবে পালসেটিলা তাও ঠিক করতে পারে। শিশুর মাথা যদি উপরের দিকে অথবা ডানে-বামে ঘুরে থাকে তবে ২/১ মাত্রা পালসেটিলা খাওয়ালেই দেখবেন শিশুর মাথা ঘুরিয়ে অটোমেটিকভাবে নিচের দিকে নিয়ে এসেছে।

Pulsatilla Pratensis: মাসিক বন্ধের চিকিৎসায় হোমিও ওষুধ গুলোর মধ্যে পুলসেটিলার স্থান এক নম্বরে। স্নেহ পরায়ণ, কথায় কথায় কেঁদে ফেলে, খুব সহজেই মোটা হয়ে যায়….এই ধরণের মেয়েদের বেলায় ভালো কাজ করে। মাত্রা হবে নিম্ন শক্তিতে (Q, ৩,৬ ইত্যাদি) ৫/১০ ফোটা করে রোজ ৩ বার।

নোট: আল্ট্রাসনোগ্রাম করে যদি দেখেন যে বাচ্চার ওজন ৪ কেজি হয়ে গেছে তবে প্রেসক্রিপশন এর ওষুধগুলো খাওয়া বন্ধ করে দিবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন