ঘাড় ব্যথা : সেরা চিকিৎসা হোমিওপ্যাথি

ঘাড় ব্যাথা এর অন্যতম প্রধান কারন হল সার্ভিকাল স্পনডাইলোসিস। আমাদের মেরুদন্ড গঠিত হয় হাড়, মাংশপেশী, হাড়ের জোড়া ইত্যাদি নিয়ে।চিকিৎসা শাস্ত্রে মেরুদন্ডের ক্ষয় রোগ হল স্পন্ডাইলোসিস বলা হয় আর মেরুদন্ডের ঘাড়ের অংশের ক্ষয়কে বলে সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস বলে।

সারভিক্যাল স্পনডিওলাইসিস-এর কারণ : 

যখন মেরুদণ্ড ও ঘাড়ের সংযুক্ত স্থানে যে কার্টিলেজ ও হাঁড় থাকে সেটা যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হতে থাকে কোনো চাপ সৃষ্টির কারণে, তাহলে এই ধরণের সমস্যা মূলত হয়ে থাকে| ঘাড়ের সংযুক্ত জায়গায় বার বার চাপ পড়লে এই ধরণের সমস্যা হওয়া খুবই স্বাভাবিক| যার ফলে ভীষণ যন্ত্রনা ও অনেক সময় ঘাড় এপাশ ওপাশ করে কোনো কাজ করাও মুশকিল হয়ে পরে এর ফলে এটিকে সারভিক্যাল অস্টিওআর্থরাইটিস অথবা নেক আর্থরাইটিসও বলা হয়ে থাকে|

বয়স বাড়ার রোগ এটি। স্পন্ডাইলোসিসের পরিবর্তন শুরু হয় ৪০ বৎসর বয়সের পর থেকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর আগেও শুরু হয় হাড়ের ক্ষয়। বর্তমান অনিয়ম ও জীবনশৈলী, কোনো নির্দিষ্ট সময় ছাড়াই কাজ করা, ঘন্টার পর পর ঘন্টা অকারণে মোবাইলের ব্যবহার করার ফলে অনেক অল্প বয়েসেই এখন এই ধরণের সমস্যা দেখা দিচ্ছে| আনুপাতিক হার পুরুষ বা মহিলা রোগীদের মধ্যে প্রায় সমান সমান।

উপসর্গ:

ঘাড়ের ব্যাথা অনেক সময় কাঁধ থেকে উপরের পিঠে, বুকে , মাথার পিছনে বা বাহু হয়ে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।ঘাড় থেকে হাতে নেমে আসা স্নায়ু বা নার্ভের উপর চাপ পড়লে পুরো হাতেই ব্যাথা হতে পারে।

সার্ভিক্যাল স্পন্ডোলাইসিসের সবচেয়ে মারাত্মক দিক হল যখন স্পাইনাল কর্ডের উপর চাপ পড়ে। হাত পায়ে দূর্বলতা, হাঁটতে অসুবিধা হতে পারে। পায়খানা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে।

ঘাড় নাড়াতে গেলে ব্যাথা লাগে। ডানে বায়ে ঘাড় ঘুরাতে সমস্যা হবে।ঘাড়ে স্থবিরতা লাগে বা জ্যাম মেরে ধরে থাকে।

ব্যাথার সাথে হতে পারে হাতে, বাহুতে ঝিন ঝিন, সির সির, অবশ ভাব, সূচ ফোটানোর অনুভুতি সাথে হাত দিয়ে কাজ করতে অসুবিধা।

ডাক্তারি পরীক্ষা :

১. রক্তের গ্লুকোজ
২. প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা।
৩. ঘাড়ের এম আর আই
৪. ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি।

চিকিৎসা :

১. ঔষধঃ- ব্যাথার ঔষধ, মাংশপেশী শিথিল করার ঔষধ, দুশ্চিন্তা কমানোর ঔষধ।
২. ফিজিওথেরাপীঃ- ঘাড়ের টানা বা সার্ভিক্যাল ট্রাকশান, শর্ট ওয়েভ ডায়াথার্মি,  ম্যাসাজ, ট্রান্সকিঊটেনিয়াস ইলেক্ট্রিক নার্ভ স্টিমুলেশান ইত্যাদি

Types of exercises for Cervical Spondylosis –

সাধারণত সারভিক্যাল স্পনডিওলাইসিস-এর ব্যায়ামকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি:
১. Flexibility Exercises
২. Isometric exercises
৩. Stretching exercises

Flexibility Exercises (ফ্লেক্সিবল এক্সারসাইজ)

এই ধরণের এক্সারসাইজকে ফিজিক্যাল থেরাপি ও বলে, এই ধরণের ব্যায়াম আপনি খুব সহজেই করতে পারেবন যে কোনো সময়|

১. Neck Flexion and Extension (Drop and Raise)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর আপনার থুতনি আপনার ছাতি অর্থাৎ বুকে স্পর্শ করান ধীরে ধীরে ও ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড অবধি স্থায়ীভাবে থাকুন ,এবার আস্তে আস্তে মাথা তুলুন| ঠিক একই ভাবে আপনার মাথাকে ধীরে ধীরে পিছনের দিকে নিয়ে যান অথবা ১০ সেকেন্ড ঐভাবে থাকুন ও আস্তে আস্তে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন|

এটি করার সময় আপনার ঘাড়কে সামনে ও পিছনে দুভাবেই করতে হবে, এই ব্যায়ামের ফলে ঘাড়ের পেশী সহজেই নমনীয় হবে|

২. Head Tilt toward left and right side (মাথার বাঁ দিক ও ডান দিকে ব্যায়াম)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর ধীরে ধীরে আপনার মাথাটিকে ডান কাঁধে স্পর্শ করান ও ৫ থেকে ১০ সেকেণ্ড এইভাবেই থাকবার চেষ্টা করুন, আস্তে আস্তে আগের অবস্থানে ফিরে আসুন| এবার একইভাবে বাম কাঁধে স্পর্শ করান ও কিছুক্ষণ স্থায়ী থেকে আবার আগের অবস্হায় ফিরে আসুন|

মাথা স্পর্শ করানোর সময় যতটুকু আপনি নিয়ে যেতে পারবেন কেবল সেটুকুই নিন প্রথমেই জোর দেবেন না।

৩. Neck Rotation (নেক রোটেশন)

কোনো চেয়ারে সঠিক ভঙ্গিতে বসুন বা সঠিক ভাবে দাঁড়ান| আপনার থুতনি সোজা রাখুন একবার সহজ ভাবে ডানদিকে ঘুরুন ৫ থেকে ১০ মিনিট স্থায়ীভাবে থেকে আবার সোজা অবস্থানে ফিরে আসুন|
একইভাবে বামদিকে ঘুরুন ঠিক আগের মতোই নির্দিষ্ট সময় স্থায়ী থেকে আবার ফিরে আসুন|

দুপাশেই অন্তত পাঁচবার করে করুন|

৪. Neck Retraction (নেক রেট্রাকশন)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান ঘাড় পিছন দিকে করে মাথা সোজা করে আপনার থুতনিকে সামনের দিকে নিন, এইভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিট বসুন এরপর আপনি আবার আপনার আগের স্থিতিতে ফিরে আসুন| ঠিক এইভাবেই আপনি অন্তত ৫ বার ব্যায়ামটি করুন|

৫. Shoulder Rolls (শোল্ডার রোলস)

ঘাড় এবং কাঁধের ব্যায়ামের ফলে আমাদের সংযুক্ত জায়গার হাঁড় ও পেশীগুলি সতেজ থাকে| একটি চেয়ারে সোজা হয়ে প্রথমে বসুন তারপর আপনার কাঁধকে রোল করুন অর্থ্যাৎ উপরে নিচে ও পাশে নিন, এইভাবে ৫ বার এটি করুন| এবার উল্টো গতিতে আবার আপনার কাঁধের রোল করুন উপর নিচে ও পাশে, অন্তত ৫ বার এটি করুন|

Isometric exercises (ইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ)

ইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ আমাদের ঘাড়ের যন্ত্রনা থেকে আমাদের মুক্তি দেবে ও হাঁড়ের শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে তাকে নমনীয় করতে সাহায্য করবে|এই ধরণের ব্যায়ামে হাতের সাহায্যে ব্যায়াম করা হয়ে থাকে| এই ধরণের ব্যায়াম করার জন্য তাই একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে বসা প্রয়োজন| দাঁড়িয়ে এই ধরণের ব্যায়াম করা ভালো তবে চেয়ারে সোজা ভাবে বসেও এই ধরণের ব্যায়াম করা যেতে পারে|

১. Neck Extension – নেক এক্সটেনশন

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর আপনার হাতের তালুর সহায়তায় আপনার মাথাকে সামনের দিকে প্রেসার দিন| প্রেসার দেবার সময় আপনার মাথা ও ঘাড়ের মধ্যে একটু প্রতিরোধের প্রক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ|

২. Neck Flexion (নেক ফ্লেক্সিয়ন)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর আপনার চোখের মাঝখানের সংযোগে আপনার হাতের আঙুলগুলি রাখুন সাথে হালকা করে আপনার মাথাকে পিছনের দিকে প্রেসার দিন| মাথায় রাখবেন এক্ষেত্রেও যেন আপনার মাথা ও ঘাড় খানিকটা প্রতিরোধ প্রেসার দেয় তবেই এটি সঠিকভাবে সম্পূর্ণ হবে|

৩. Side Bending (সাইড বেন্ডিং)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর সাধারণ ভাবেই আপনার মাথাটিকে রাখুন, এবার আপনার এক কানে হাত দিন ও সাথে প্রেসার দিন সাথে সাথে আপনার মাথা দিয়ে প্রেসারটিকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করুন| একইভাবে অন্যপাশেও অন্তত ৫ বার করুন|

৪. Stretching exercises (স্ট্রেটিচিং এক্সারসাইজ)

এটি শরীরকে প্রসারিত করে করা হয়ে থাকে অর্থ্যাৎ শরীরকে সহজে ও সঠিক ভাবে প্রসারিত করে এই ধরণের এক্সারসাইজ করাই হলো পদ্ধতি|

Stretching exercises (স্ট্রেটিচিং এক্সারসাইজ )

১. Neck Stretching (right and left side) ( নেক স্ট্রেটিচিং (ডান ও বাম পাশে))

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর আপনার ডান কানকে ডান কাঁধের দিকে নিয়ে যান সাথে আপনার বাম কাঁধকে প্রসারিত করুন যাতে আপনি খানিকটা স্ট্রেচ অনুভূতি করেন| এইভাবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আপনি করুন| ঠিক একইভাবে আপনি অপরপাশেও করুন| এইভাবে ৫ থেকে ৭ বার করুন ও আবার আপনার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন|

২. Sternocleidomastoid (SCM) Strech (স্টার্নকেইডোমেস্টিড (SCM) স্ট্রেচ)

চেয়ারে সোজা হয়ে বসুন বা একদম সোজা হয়ে দাঁড়ান তারপর দড়ির মতো আপনার মাথাটিকে ঘোড়ান, এবার সেটিকে একবার ডান পাশে ও বাম পাশে রাখুন কিছুক্ষণের জন্য তারপর আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসুন, এইভাবে ৫ থেকে ৭ বার অভ্যাস করুন।

ঘাড় ব্যাথা নিরাময়ে প্রতিদিনের করণীয় কিছু অভ্যাস :

১. অল্প হলেও কিছু সময় ব্যায়াম করুন এতে আপনার ঘাড়ের হাঁড়ের জোর বাড়বে সাথে নমনীয়তাও

২. কম্পিউটার বা টেবিলে অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে কোনো কাজ করবেন তখন সবসময় উচিৎ কিছুক্ষণ অন্তত ব্রেক নেওয়া নেহাৎ ১০ মিনিট হলেও

৩. ঘুম থেকে ওঠার সময় যদি আপনি একপাশে শুয়ে থাকেন তাহলে সবসময় আরেক পাশে মোড় নিয়ে বা সোজা হয়ে তবেই উঠুন বিছানা থেকে

৪. ঘাড়ের ব্যাথা খুব বেশি বাড়লে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াই সবচেয়ে উপকারী, সাথে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন সম্পূর্ণ বিশ্রাম ছাড়া কোনো ব্যাথাই পুরোপুরি ঠিক হবে না

৫. যদি আপনি বেশি সময়ের জন্য কোথাও বাইরে বেড়াতে বা বেড়িয়ে থাকেন তাহলে ফার্ম কলার ব্যবহার করা যেতে পারে.

৬. যদি আপনার ঘাড়ে বা কাঁধে কোনরকম ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে কখনই আপনার কোনরকম ব্যায়াম করা উচিৎ না

৭. একইরকমভাবে কখনই বসে থাকা উচিৎ নয় কারণ এটি খুবই ক্ষতিকারক

৮. অপ্রয়োজনে অনেকক্ষণ সময় ধরে ড্রাইভ করা কখনই উচিৎ না

৯. খারাপ রাস্তা দিয়ে গাড়ি না চালানই ভালো বিশেষ করে যখন আপনি চার চাকার গাড়ি চালাবেন

১০. অনেক সময় অনেকেই একের বেশি বালিশ ব্যবহার করে শোবার জন্য এটি কিন্তু একেবারেই সঠিক পদ্ধতি না

১১. এমন কোনো ভারী বস্তু ওঠানো উচিৎ নয় যা আপনার ঘাড়ের উপর চাপ তৈরী করে

১২. যখনি আপনি কোনো কিছুর জন্য টার্ন নেবেন তখন সবার আগে আপনার পায়ের ব্যবহার করুন আপনার মাথা বা শরীরের মাধ্যমে টার্ন নেওয়া একেবারেই উচিৎ না

১৩. সিগারেট অথবা যেকোনো ধুমপান এড়িয়ে চলুন

১৪. আপনি এমন কোনো ভঙ্গিতে কখনই বেশিক্ষণ বসবেন না যা আপনার শরীরের উপর চাপ তৈরী করে

ঘাড় ব্যথা নিরাময়ে কয়েকটি উপদেশ :

১৫. শক্ত সমান বিছানায় এক বালিশে চিত হয়ে ঘুমাতে হবে।

১৬. ঘুমানোর সময় ঘাড়ের নিচে বালিশ দিতে হবে।

১৭. দরকার হলে বালিশ নিচে টেনে নামিয়ে ঘাড়ের নিচে নেবেন বা কম উচ্চতার বালিশ ব্যবহার করবেন।

১৮. ঘাড় সামনে ঝুঁকিয়ে বেশিক্ষন কাজ করা যাবেনা।
কাজের জায়গায় চেয়ার টেবিল এমন ভাবে রাখবেন যাতে ঘাড় সামনে না ঝুুঁকিয়ে কাজ করতে না হয়।

১৯. ব্যথা বেশি হলে ঘাড়ে হালকা গরম সেক দিতে পারেন।

২০. সার্ভিক্যাল কলার ব্যবহার করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে।

ঘাড় ব্যথা মূল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে রোগ আরোগ্য করা হোমিওপ্যাথি এর একমাত্র লক্ষ্য

 

ডাঃ রাজিয়া সুলতানা (কাজল রেখা)
চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী, কনসালটেন্ট হোমিওপ্যাথ
ডি, এইচ, এম, এস (ঢাকা)
আর এস (এফ এইচ এম সি এইচ)

আপনার মন্তব্য লিখুন