বরফ-খাওয়া (প্যাগোফেজিয়া) -এক অদ্ভুত রোগ

প্যাগোফেজিয়া এক অদ্ভুত রোগ, আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত বরফের প্রতি বেশি আসক্ত হয়। কারণে অকারণে বরফ খেতে পছন্দ করে। এতে আক্রান্ত মানুষেরা নানারকম অখাদ্য যেমন চুল, আঠা, ময়লা, কলমের ক্যাপ। আরও অনেক খারাপ বা নোংরা পদার্থ মুখে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে এবং চাবাতে পছন্দ করে। বারবার বরফ চিবুতে ইচ্ছা করা বা বরফ দেওয়া পানীয় পান করাকেই প্যাগোফেজিয়ার মূল লক্ষণ হিসেবে মনে করা হয়। এই ইচ্ছা যদি আপনার মধ্যে হঠাৎ করে হয় কিংবা কিছুদিনের জন্য হয় তাহলে সেটা কোনো সমস্যা নয়। প্রায় এক মাস যাবত এমন বরফ ও বরফজাতীয় খাবারের প্রতি আসক্তি অনুভব করছেন তাহলে পিকা’য় আক্রান্ত কিনা সেটা জেনে আসাটা প্রয়োজন। বরফ খাওয়াটা খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে এটা যদি অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তাহলে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

প্যাগোফেজিয়া’র কারণ: প্যাগোফেজিয়া কয়েকটি কারণে হতে পারে তার মধ্যে

১. রক্তশূন্যতার প্রভাব থাকতে পারে

২. মানসিক অবসাদ এবং অন্যান্য কারণেও নানারকম উদ্ভট খাবার গ্রহণ করে থাকেন (অসম্ভব মানসিক চাপে থাকলে বরফ খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে মনে করেন অনেকে। এটি তখন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।)

নিচের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজেই ভালো করে জেনে নিন। তারপর চিকিৎসকের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া সহজ হবে যে, আপনার আসলে প্যাগোফেজিয়া আছে কিনা।

১। আপনি প্রতিদিন কতখানি বরফ খান?

২। কতদিন ধরে বরফের প্রতি আসক্ত আপনি?

৩। বরফ ছাড়া আর কোনো আসক্তিতে ভুগছেন?

৪। রোগের আর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে আপনার শরীরে?

প্যাগোফেজিয়ার লক্ষণ

প্যাগোফেজিয়ার সাথে এ্যানিমিয়া বা রক্তশুন্যতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনি প্যাগোফেজিয়ায় আক্রান্ত হলে বেশকিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে-

১. অবসাদ এবং দূর্বলতা

২. ত্বক সাদাটে হয়ে যাওয়া

৩. বুক ব্যথা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

৪. মাথা ঘোরা

৫. ঘনঘন পিপাসা পাওয়া এবং অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া

৬. ক্ষুধা না পাওয়া

৭. হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া

৮. ঠোঁট বার বার শুকিয়ে যাওয়া

৯. গলা শুকিয়ে যাওয়া

১০. দিন দিন শরীর শুকিয়ে যায়

১১. শারীরিক বৃদ্ধি কমে যায়।

১২. ঘুম কমে যায়

১৩.  ত্বক এ নানা রকমের সমস্যা দেখা দেয়  যেমন মুখে ব্রণ এর মতো কিছু হয় ইত্যাদি

ক্ষতিকর দিক:

১. দাঁতের এনামেল ভাংছে: বরফের আঘাতে দাঁতের ওপরের শক্ত এনামেলের স্তরে ফাটল ধরতে পারে, খুব সূক্ষ্ম সেই ফাটলগুলো দাঁত তুলে ফেলার মত পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। এমনকি এতটা মারাত্মকও হতে পারে যখন রুট-ক্যানাল থেরাপি দরকার হয়।“

২. দাঁতের ক্যাভিটি (গর্ত) এবং সেনসিটিভিটি বাড়ে: বরফ চিবিয়ে খেলে যে শুধু দাঁতের এনামেলেরই ক্ষতি তা না, এটা আরও গভীর পর্যন্ত প্রভাব ফেলে। দাঁত ভেঙে যেতে পারে, বা দাঁতের ফিলিং করা থাকলে সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩. চোয়ালের মাংসপেশিতে ব্যাথাও হতে পারে।

৪. একটা সময় পর দাঁতে গরম বা ঠাণ্ডা খাবার সহ্য হয়না।

৫. মাড়িতে ইনফেকশন: বরফ চিবানের সময় বরফের ধারালো কুঁচি মাড়ির মাংসকে ছিদ্র করে বা কেটে দিতে পারে। এতে দেখা দিতে পারে আরও মারাত্মক সমস্যা।

৬. খনিজ উপাদানের ঘাটতি: যে খাবার বা বস্তুর কোন পুষ্টিমান নেই সেটা মুখে নিয়ে চাবানো শরীরে Iron এর ঘাটতির (anemia) লক্ষণ।

৭. প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়: কিছু পুষ্টি আছে যেগুলো শরীরে অনুপস্থিত হলে জিহ্বা অথবা মাড়িতে প্রদাহ হয়ে থাকে, এবং বরফ মুখে নিলে সেটার প্রশমন হয়। কিন্তু সমস্যা হল সেটা একে তো সাময়িক সমাধান, তার উপর এই বরফ থেরাপিতে আপনার জিহ্বা ফুলে যেতে পারে। এবং আরও বড় ধরনের বিপদ আসতে পারে।

৮. সারাক্ষণ বরফ চিবালে পানিশূন্যতা ও বমি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৯. অপুষ্টি: বরফ বেশি চিবালে ক্ষুধা কমে যায়। এতে খাওয়া কম হয় এবং এ থেকে অপুষ্টির শিকার হতে পারেন।

সাবধানতাঃ

১. প্যাগোফেজিয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই আপনার যেটা করা উচিত সেটা হল ভালো করে নিজেকে জানা।

২. রক্তশূন্যতার কারণেই আপনার বরফে আসক্তি হচ্ছে কিনা সেটা জানা দরকার। এমন কিছু হলে আপনি কেবল আপনার রক্তশূন্যতার সমস্যার সমাধান করেই প্যাগোফেজিয়ার সমস্যা দূর করতে পারেন।

৩. তবে চিকিৎসক না বলা পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াই ভালো। অনেকসময় অনেকে বরফের প্রতি নিজের আসক্তি দেখে নিজেকে প্যাগোফেজিয়ার রোগী ভেবে বসেন। আর এর কারণ এ্যানিমিয়া ভেবে নিয়ে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তাতে হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কারণ আমাদের শরীর অতিরিক্ত পরিমাণ আয়রন গ্রহণ করতে পারে না। এতে শরীরে আয়রন জমে কোষ্ঠকাঠিন্য, ক্যান্সার বা মারাত্মক কোনো সমস্যা তৈরি হতে পারে।

৪. এ্যানিমিয়া ছাড়াও যদি মানসিক চাপ থেকে প্যাগোফেজিয়ার সমস্যা তৈরি হয় তাহলে সিবিটি বা কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে মানসিক কোনো সমস্যা থেকে বরফ গ্রহণের সমস্যা তৈরি হলে সেটা দ্রুত চলে যাবে।

৫. আপনার জানা উচিত কেন আপনি এই পদক্ষেপ নিবেন। প্যাগোফেজিয়া কি এতই গুরুতর কোনো সমস্যা?

হ্যাঁ, সেভাবে বলতে গেলে ছোটোখাটো থেকে শুরু করে বেশ বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে প্যাগোফেজিয়া।

হয়ত ভাবছেন এতে কিছু হয়না, কিন্তু খুব মারাত্মক কিছু সমস্যার লক্ষন হতে পারে এটা। আপনার মাঝে হয়ত বড় কোন সমস্যা লুকিয়ে আছে

বরফ বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহার করা উচিত, নিয়মিত খাদ্য হিসেবে গ্রহন করা উচিত না। বরফ মুখে নিয়ে চাবানোটা সাদামাটা মনে হলেও এটা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। সবাইকে সচেতন হবার অনুরোধ রইল।

আপনার মন্তব্য লিখুন