মাদকাসক্তি  এর ভয়াবহতা এবং  তার  হোমিওপ্যাথিক  চিকিৎসা

মাদক কি? মাদকাসক্তি কি?

উত্তেজনা ও অবসাদ সুষ্টিকারী যে সকল দ্রব্য গ্রহণে মানুষের স্বাভাবিক চেতনা লোপ পেয়ে নেশার সৃষ্টি করে ও আচারনের অনাকাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটে এবং তা গ্রহণের জন্য তীব্র আসক্তি সৃষ্টি করে ও যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার কারণ ঘটাতে পারে এমন সব দ্রব্যকেই মাদকদ্রব্য বলে।

যেমন – মদ, হেরোইন, মরফিন, গাঁজা, কোকেন, আফিম, ফেন্সিডিল, বিভিন্ন রকমের ইনজেকশন, ইয়াবা ট্যাবলেট, বিভিন্ন রকমের ঘুমের ঔষুধ, জুতায় লাগানোর আঠা বা ড্যান্ডি আঠা, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি।

সবগুলোই যে শুধু নেশার জন্যে ব্যাবহার হয় তা নয়। যেমন ফেন্সিডাল ঠান্ডার ঔষুধ হিসেবে, ঘুমের ঔষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীদের ঘুম পাড়ানোর জন্য এবং ড্যান্ডি আঁঠা জুতোয় ব্যাবহার করা হয়।

কিন্তু মানুষ যখন নেশার জন্য এগুলো ব্যাবহার করে বা এর প্রতি আসক্ত হয় তখনই এটি মাদকদ্রব্য।

বর্তমান সময় তেমনি এক নেশা হলো ড্যান্ডি, ড্যান্ডি এর নেশা খুব ভয়ঙ্কর, মাথা ঠিক থাকেনা।

ড্যান্ডি হল এক প্রকার গ্লু গাম বা আঠা জাতীয় উদ্বায়ী পদার্থ বা সাধারণ তাপমাত্রায় সহজেই বাষ্পে বা ধূম্রে পরিণত হয়। সাধারণত চার প্রকার জৈব যৌগ যথা- টলুইন, বেনজিন, অ্যাসিটোন ও কার্বন ট্রাই ক্লোরাইড এই গাম জাতীয় পদার্থে বিদ্যমান থাকে। বিভিন্ন প্রকার বাবার ও চামড়া জাতীয় পদার্থ যেমন- জুতা, চাকার রাবার-টিউব প্রভৃতির মেরামতকল্পে সংযোজক কারক হিসেবে এর বহুল ব্যবহার বিদ্যমান। এই প্রকার উদ্বায়ী গাম জাতীয় পদার্থ বাষ্প বা ধূম্রাকারে গন্ধ শুকা বা শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে শ্বসনতন্ত্র হয়ে রক্তের মাধ্যমে মানব মস্কিষ্কে প্রবেশ করে, প্রথমে জাগায় আনন্দের শিহরশ আর অনিয়ন্ত্রিত উম্মাদনা, পরবর্তীতে তাহা দেহে আনে এক শিথীলতার ভাব। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই পদার্থের অপব্যবহারের ফলে এর প্রতি সৃষ্টি হয় এক চরম আসক্তি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘গ্লু স্নিফিং’ বা বাংলায় ‘গ্লু গাম শুকা’ নামে পরিচিত। আর সাধারণ মানুষ ও নেশাগ্রস্তদের নিকট ইহা ড্যান্ডি নামে পরিচিত। লিখেছেন ডা: মো: কফিল উদ্দিন চৌধুরীই নেশার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ কারা?

১. সমাজের সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কিশোর-কিশোরী ও সদ্য বয়োপ্রাপ্ত শ্রেণী।

২. অন্য প্রকার নেশায় আসক্ত ব্যক্তিবর্গ।

৩. শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের স্বীকার অল্প বয়স্ক জনগোষ্ঠী।

৪. আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু।

৫. অতি চঞ্চল ও অমনযোগী শিশু।

৬. হতাশা, উদ্বিগ্নতা, অত্যধিক মানসিক চাপে থাকা জনগোষ্ঠী।

৭. এই প্রকার নেশার প্রতি কৌতুহল প্রবণ কিশোর-কিশোরী।

৮. অসৎ সঙ্গ,তীব্র শারীরিক ও মানসিক আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপ ও

৯. এন্টি সোস্যাল পার্সনালিটি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গ।

এই নেশার ক্ষতিকর প্রভাব :

এই প্রকার নেশায় আসক্তগণ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে নানা মনো-আচরণগত, শারীরিক ও সামাজিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। এছাড়া মানব শরীরের শ্বসন, পরিপাক, স্নায়ু ও রক্ত সংবহনতন্ত্রের উপর এই প্রকার নেশার ক্ষতিকারক উপাদানসমূহ নানা বিরূপ প্রভাব ফেলে।

১.  স্বল্পমেয়াদে-কলহ প্রবণতা, উত্তেজনা তথা উম্মত্ততা, উদাসীনতা, বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাওয়া, চিত্তবিভ্রম, শ্রুতি ও দৃষ্টি বিভ্রম ইত্যাদি।

২.  দীর্ঘমেয়াদে-হতাশা, উদ্বিগ্নতা, মনোবৈকল্য, স্মৃতিভ্রম, আত্মহত্যা ইত্যাদি।

(খ) শারীরিক সমস্যা :

৩.  স্বল্পমেয়াদে-মাথা ঘোরা, চলাচলে অসংলগ্নতা, কথা জড়িয়ে আসা, হাঁটতে অসুবিধা, অবসাদ, হাত কাঁপা, চোখে ঝাপসা দেখা, ক্ষুধামন্দা, বমি বা বমি ভাব, রক্ত বমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। এমনকি নেশার অতিমাত্রায় শ্বসন ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে কিংবা শ্বাসরোধ বা দুর্ঘটনার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও ঘটতে পারে।

৪.  দীর্ঘমেয়াদে-যক্ষ্মা, এইডস, যৌন বাহিত নানা রোগ, অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, সাইনোসাইটিস, লিভার সিরোসিস, লিভার ও ফুসফুসে ক্যান্সার ইত্যাদি।

 

তবে চিন্তার কিছু নেই হোমিওপ্যাথিক এ এর অব্যর্থ  চিকিৎসা আছে।

যেমনঃ

Avena  Sativa :  হিরোইন,  প্যাথেডিনের  নেশা  দূর  করতে  এভেনা  সেটাইভা  একটি  শ্রেষ্ট  ঔষধ।  এভেনা  স্যাটাইভা  ১৫ ফোটা  করে  রোজ  তিন বেলা  করে  খেতে  থাকুন।  পক্ষান্তরে  যারা  অল্প  পরিমাণে  হিরোইন-প্যাথেডিন  নেন,  তারা  এগুলো  পুরোপুরি  বন্ধ  করে  দিন  এবং  তার  বদলে  এভেনা  স্যাটাইভা  ৫০  ফোটা  করে  রোজ  তিনবেলা  খান।  এতে  কোন  শারীরিক  সমস্যা  হবে  না।  সাধারণত  এসব  মাদকদ্রব্য  হঠাৎ  করে  বন্ধ  করে  দিলে  শরীরে  যে-সব  মারাত্মক  সমস্যা (withdrawal  symptoms)  দেখা  দেয়,  এভেনা  সেটাইভা  সেগুলোকে  সফলতার  সাথে  সামাল  দিতে  পারে।  এটি  মাদার  টিংচার (Q)  শক্তিতে  এবং  আধা  গ্লাস  হালকা  গরম  পানিতে  মিশিয়ে  খাবেন।

Asarum  europaeum :  এসারাম  ইউরো  শরীরের  ওপর  মদ-ফেনসিডিলের  প্রভাব  কমিয়ে  মদ্যপানের  নেশা  ছাড়তে  সাহায্য  করতে  পারে।  নিম্নশক্তিতে  (Q, ৩, ৬  ইত্যাদি)  ৫  থেকে  ১৫  ফোটা  করে  রোজ  তিনবার  খেতে  পারেন।  হ্যাঁ,  প্যাথেডিন,  হিরোইনের  নেশা  ছাড়াতেও  এটি  একই  মাত্রায়  ব্যবহার  করতে  পারেন।

Nux  vomica :  মদ-ফেনসিডিল  দীর্ঘদিন  সেবনে  শরীরের  যে  ক্ষতি  হয়,  নাক্স  ভমিকা  তাকে  পুষিয়ে  দিতে  পারে।  পাশাপাশি  এটি  মদ-ফেনসিডিলের  নেশা  ছাড়তে  ব্যবহার  করতে  পারেন।  মাত্রা  হবে  নিম্নশক্তিতে  (Q, ৩, ৬  ইত্যাদি)  ৫  থেকে  ১০  ফোটা  করে  রোজ  তিনবার।

Sulphuricum  acidum :  সালফিউরিক  এসিড  ঔষধটি ড্যান্ডি, মদ-ফেনসিডিলের  নেশা  ছাড়তে  একটি  অসাধারণ  ক্ষমতা  সম্পন্ন  ঔষধ।  সাধারণত  ২/ ৪  দিন  খাওয়ার  পর  থেকেই  মাদকাসক্ত  ব্যক্তি  মদ-ফেনসিডিলের  প্রতি  আকর্ষণ  হারিয়ে  ফেলে।  নিম্নশক্তিতে  (Q, ৩, ৬ ইত্যাদি)  ৫  থেকে  ১০  ফোটা  করে  রোজ  তিনবার  দুই  থেকে  কয়েক  সপ্তাহ  খেতে  পারেন।  এমনকি  নেশায়  আসক্ত  ব্যক্তি  যদি  ঔষধ  খেতে  না  চায়,  তবে  তার  মদ  বা  ফেনসিডিলের  সাথে  মিশিয়ে  খাওয়ালেও  কাজ  করবে।  তাছাড়া  পানি,  চা,  দুধ  ইত্যাদির  সাথেও  মিশিয়ে  খাওয়াতে  পারেন।

Natrum  Phosphoricum :  নেট্রাম  ফস  ঔষধটি  মরফিন,  প্যাথেডিন  এবং  হিরোইনের  নেশা  বন্ধ  করতে  সাহায্য  করে  থাকে।  নেট্রাম  ফস  নিম্মশক্তিতে (Q, ৩, ৬)  দশ  ফোটা  করে  রোজ  তিনবার  করে  খেতে  থাকুন  এবং  উল্লেখিত  নেশাসমূহ  প্রতি  সপ্তাহে  ধীরে  ধীরে  কমাতে  থাকুন।  তারপর  এক  সময়  একেবারে  বন্ধ  করে  দিন।  দীর্ঘদিন  সেবনের  পর  এসব  নেশাদ্রব্য  বন্ধ  করলে  শরীরের  যে-সব  সমস্যা  হতে  পারে,  নেট্রাম  ফস  সেগুলোকে  দূর  করে  দিবে।

Staphisagria :  বিড়ি-সিগারেট  অর্থাৎ  ধূমপানের  নেশা  ছাড়াতে  স্টেফিসেগ্রিয়া  একটি  শ্রেষ্ট  ঔষধ।  এটি  ধূমপানের  প্রতি  আকর্ষণ  কমিয়ে  দিয়ে  সেটি  বন্ধ  করতে  সাহায্য  করে।  এটি  Q,  ৩,  ৬,  ৩০  ইত্যাদি  যে-কোন  শক্তিতে  খেতে  পারেন ;  তবে  যত  নিম্নশক্তিতে  খাওয়া  যায়  তত  উত্তম।  রোজ  ৫  ফোটা  করে  সকাল-সন্ধ্যা  দু’বার।  টেবেকাম (tabacum)  নামক  ঔষধটিও  ধূমপানের  নেশা  দূর  করতে  সাহায্য  করে।  এটিও  একই  নিয়মে  খেতে  পারেন।  ধূমপানের  নেশা  ছাড়াতে  আরেকটি  উৎকৃষ্ট  ঔষধ  হলো  চায়না (China  officinalis).

নেশাকর  ড্রাগ  যারা  দীর্ঘদিন  থেকে  খেয়ে  আসছে,  তাদের  পক্ষে  এগুলো  হঠাৎ  করে  বন্ধ  করা  সম্ভব  নয়। কারণ  এতে  শরীরে  কিছু  মারাত্মক  অসুবিধার  সৃষ্টি  হয়।  এই  জন্য  এসব  ড্রাগ  সেবনের  পরিমাণ  প্রতি  সপ্তাহে  একটু  একটু  করে  কমিয়ে  দিতে  হবে।  এভাবে পরিমাণ  কমাতে  কমাতে  একেবারে  বন্ধ  করে  দিতে  হবে।

ড্রাগের  পরিমাণ  কমানোর  ফলে  শরীরে  যে-সব  অসুবিধার  সৃষ্টি  হয়,  সেগুলো  দূর  করার  জন্য  ঔষধ  খেতে  হবে।

দীর্ঘদিন নেশা করার পর  চেষ্টা করে পরবর্তীতে  সেটি  বন্ধ  করতে  সক্ষম  হলেও  সেই  নেশার  প্রতি  অনেক  বছর  পরও  একটা  মারাত্মক  আকর্ষণ  থেকেই  যায়।  ফলে  সুযোগ  পেলে  সেই  নেশা  আবারও  শুরু  করে  দিতে  পারে।  এজন্য  নতুন  কোন  ভালো  বিষয়ে  নেশা  সৃষ্টি  করা  দরকার।

যেমন  স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের  ভালোবাসা,  জ্ঞান  অর্জনের  নেশা,  ইবাদত-বন্দেগী,  লার্নিং  গেম,  মানবসেবা,  ছবি  আঁকা,  কম্পিউটার,  ফটোগ্রাফ ইত্যাদির  নেশা  সৃষ্টির  মাধ্যমে সবকিছু ভুলে  থাকার  চেষ্টা  করতে  হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন