স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেদানা এর যত উপকারিতা

বেদানা/আনার বা ডালিমকে স্বর্গীয় ফল বলা হয়, কারণ এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জাদুকরী গুনাগুন।বেদানা, আনার বা ডালিম এক রকমেরই ফল। বেদানা আকারে ডালিমের চেয়ে অনেক ছোট এবং মিষ্টি স্বাদের।

বাংলা নামঃ বেদানা
ইংরেজি নামঃ পমেগ্রানাটে
বৈজ্ঞানিক নামঃ Punica গ্রানাতুম

  • পাঞ্জাব ও কাশ্মীরেও এ ফলকে বেদানা বলে।
  • হিন্দি, উর্দু, ফার্সি ও পশতু ভাষায় একে আনার বলা হয়।
  • কুর্দি ভাষায় ‘হিনার’ এবং আজারবাইজানি ভাষায় একে ‘নার’ বলা হয়।
  • সংস্কৃত এবং নেপালি ভাষায় বলা হয় ‘দারিম’।

বেদানা গাছ গুল্ম জাতীয়, ৫-৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাকা ফল দেখতে লাল রঙের হয় । ফলের খোসার ভিতরে স্ফটিকের মত লাল রঙের দানা দানা থাকে । সেগুলোই খেতে হয়। এর আদি নিবাস ইরান এবং ইরাক।
ডালিম ফল ডালিমগাছের পাতা, ছাল, মূল, মূলের ছাল সবই ওষুধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ডালিম ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পাকলে হলুদ এবং লাল হয়। ফলের ভিতরে বীজের কোষ হয় এবং কোষের উপর পাতলা আবরণ থাকে।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার

ডালিমের পুষ্টিমান, ওষুধি গুণ ও বহুবিদ ব্যবহার অনেক ধর্মীয় বই থেকে অনেক স্থানে লেখা আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ডালিমে ৭৮ ভাগ পানি, ১.৫ ভাগ আমিষ, ০.১ ভাগ স্নেহ, ৫.১ ভাগ আঁশ, ১৪.৫ ভাগ শর্করা, ০.৭ ভাগ খনিজ, ১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ১৪ মিলিগ্রাম অক্সালিক এসিড, ৭০ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৩ মিলিগ্রাম রাইবোফ্লাভিন, ০.৩ মিলিগ্রাম নায়াসিন, ১৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ইত্যাদি থাকে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর ব্যবহার সব জায়গায় পরিচিত।

ঔষধিগুণ

ডালিম ফল আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসায় পৈথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডালিমে বিউটেলিক এসিড, আরসোলিক এসিড এবং কিছু আ্যলকালীয় দ্রব্য যেমন- সিডোপেরেটাইরিন, পেপরেটাইরিন, আইসোপেরেটাইরিন, মিথাইলপেরেটাইরিন প্রভৃতি মূল উপাদান থাকায় ইহা বিভিন্ন রোগ উপশমে ব্যবহৃত হয়।

কবিরাজী মতে ডালিম হচ্ছে হৃদয়ের শ্রেষ্ঠতম হিতকর ফল। এ ফল কোষ্ঠ রোগীদের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়। গাছের শিকড়, ছাল ও ফলের খোসা দিয়ে আমাশয় ও উদরাময় রোগের ওষুধ তৈরি হয়। ইহা ত্রিদোষ বিকারের উপশামক, শুক্রবর্ধক, দাহ-জ্বর পিপাসানাশক, মেধা ও বলকারক, অরুচিনাশক ও তৃপ্তিদায়ক। ডালিমের ফুল রক্তস্রাবনাশক।

বেদানার যত উপকারিতা

১. হৃৎপিণ্ড ভালো রাখে

হৃদরোগ আমাদের জীবনযাত্রায় অন্যতম আতঙ্ক রোগ। প্রতিদিন তেল চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করে থাকার ফলে আমাদের ধমনীর আবরণে চর্বি জাতীয় পদার্থ জমে যাচ্ছে। যার ফলে ধমনী আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে সংকুচিত হতে থাকে। মাংস পেশিতে দ্রুত অক্সিজেন পৌঁছে দেয় বেদানা রস। প্রতিদিন একটা বেদানার রস দিতে পারে হৃদরোগের হাজারো সমস্যা থেকে মুক্তি। নিয়মিত বেদানার রস এই চর্বির স্তরকে গলিয়ে পরিষ্কার করে। বেদানায় উপস্থিত থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে। যা আমদের শরীরে রক্তের মধ্যে মোনোসাইট কেমোট্যাকটিক প্রোটিন ক্ষতিকর পদার্থ কমিয়ে ফেলে। সুতরাং আমাদের হৃৎপিণ্ড ভালো রাখতে বেদনার জুড়ি নেই।

২. ত্বক সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখে

বেদানা বা ডালিম ত্বক সুস্থ রাখতে অনেক উপকার করে। ত্বকের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণকে প্রতিরোধ তৈরি করে থাকে। ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি, সাইট্রিক আসিড, ট্যানিন সমৃদ্ধ বেদানা ত্বকের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে বিশেষ উপকারী।

৩. স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধে

ডালিম বা বেদানার রস ক্যান্সার প্রতিরোধে অনেক উপকারি খাদ্য। স্কিন ক্যান্সার ও প্রস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধ করতে বেদানার রস সাহায্য করে এবং অ্যানিমিয়া রোগীদের জন্য বেদানা রস খুবই উপকারি।

৪. রক্তস্বল্পতা দূর করতে

বেদানাতে রয়েছে প্রচুর আয়রন যা রক্তস্বল্পতা দূর করে। রুচি বৃদ্ধি করে, কোষ্ট কাঠিন্য রোধ করে। জন্ডিস, বুক ধড়ফড়ানি, বুকের ব্যথা, কাশি, কণ্ঠস্বর পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। পুরনো পেটের অসুখ ও জ্বর সারাতে সাহায্য করে।

৫. হাড় ভালো রাখে

বেদানার রসে আছে পটাশিয়াম ও পলিফেনল যা কিনা কার্টিলেজ নামক রোগ রোধ করার জন্য খুবই উপকারী। হাড়ের সংযোগস্থলে কার্টিলেজ নামে অস্থি রস থাকে যা হাড়ের ক্ষতি করে। এছাড়াও হাড়ের নানাবিধ রোগ যেমন হাড়ের রোগ অস্টিওপোরেসিস থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৬. দাঁতের যত্নে

বেদানাতে উপস্থিত রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা কিনা দাঁতে প্লাক জমতে বাধা দেয়। জিন জিভাইটিস নামে মাড়ির রোগ প্রতিরোধ করতে বেদানার ভূমিকা অপরিসীম। দাঁত ভালো রাখার জন্য প্রতিদিন অল্প হলেও বেদানা খাওয়া উচিত।

৭. ডায়রিয়া প্রতিরোধে

ডায়রিয়া হলে সকাল-বিকাল বেদানার রস খেলে ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পেতে বেদানার রস খুবই উপকারি।

৮. সর্দি-কাশি থেকে বাঁচতে

সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা পেতে বেদানার রস ওষুধ হিসাবে কাজ করে। বেদানাতে আছে পটাশিয়াম ও ফাইবার যা ইমিউন সিস্টেম মজবুত রাখতে সাহায্য করে।

৯. কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রণে

বেদানার প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা টক্সিন দূর করে ডিটক্সিফিকেশনে সাহায্য করে। কোলেস্টরল নিয়ন্ত্রনে বেদানার রসে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এল ডি যা হার্টের মাসলসে অক্সিজেন সরবরাহ ভাল রাখে। ফ্রি রেডিকেলস্ প্রতিরোধ করে কোলেস্টরেল বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। আবার আর্টারি পরিস্কার রাখতে সাহায্য করে বেদানা। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে রোজ বেদানার রস খাওয়া উচিত।

১০. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

বেদানার মধ্যে রয়েছে প্রচুর পটাশিয়াম ও ভিটামিন ‘সি’। প্রতিদিন বেদানার রস খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। এর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট গুণও গ্রিন টি বা রেড ওয়াইনের থেকে প্রায় তিন গুণ বেশি। এর মধ্যে রয়েছে তিন প্রকার অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। ট্যানিন, অ্যান্থো সিয়ানিন ও এলাজিক অ্যাসিড। অ্যান্থোসিয়ানিন দেহ কোষ সুস্থ রাখার ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে পারে। ফলে ফোলা ভাব কমে যায়, ক্ষয় রুখতেও সাহায্য করে।

বেদানার যত উপকারিতা

১১. রক্তচাপ কমাতে

প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকার কারণে বেদানা সিস্টোলিক ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে স্ট্রেস, টেনশন কমে। হার্টের সমস্যা থাকলে হার্টের অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।

১২. পেশির ব্যথা দূর করতে

বাত, অস্টিওআর্থারাইটিস, পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে বেদানা। তরুণাস্থির ক্ষয় রুখতেও উপকারী বেদানা।

১৩. দেহের ক্যান্সার প্রতিরোধে

শরীরে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিতে বেদানা সাহায্য করে। ফলে ক্যান্সার নিজে থেকেই মরে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে অ্যাপপটোসিস। প্রস্টেট ক্যানসার, ব্রেস্ট ক্যানসারে ভাল কাজ করে বেদানার অ্যান্টিক্যানসার এজেন্ট।

১৪. রক্তপাত বন্ধ করে

হঠাৎ দুর্ঘটনায় শরীরের কোনো অংশ ছিঁড়ে গেলে, থেঁতলে গেলে বা কেঁটে রক্তপাত বের হলে ডালিম ফুল কচলিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে চেপে ধরলে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। ফুল না পেলে পাতাও ভালো কাজ করে।

১৫. হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়া

নাক দিয়ে রক্ত পড়া বা রক্তঝরা একটি সাধারণ রোগ। বহু মানুষের এরকম হয়। অনেকের বিনা কারণে নাক দিয়ে রক্ত যায়। শিশুদের মাঝেও এটা লক্ষ্য করা যায়। আঘাত, পলিপ বা কোনো কারণ ব্যতীত যদি নাক দিয়ে রক্ত পড়ে বা রক্ত যায় ডালিম ফুল কচলিয়ে রস নিয়ে নাকে শ্বাস নিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

১৬. আমাশয় নিরাময়ে ডালিমের খোসা

ডালিমের খোসা সিদ্ধ করে সেবন করলে আমাশয় নিরাময়ে ভলো ফল পাওয় যায়। আমাশয় নিরাময়ে ডালিমের কাঁচা খোসা এবং শুকনা খোসা দুটোই কার্যকরী। তাই ডালিম খেয়ে খোসা ফেলে না দিয়ে শুকিয়ে ঘরে রেখে দেয়া ভালো।

১৭. বাগি বা উপদংশ নিরাময়ে

ডালিম গাছের ছাল গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিলে শরীরের যে কোনো স্থানের বাগি বা উপদংশ নিরাময়ে ভালো কাজ করে। মহিলাদের প্রদররোগ নিরাময়ে ডালিম ফুল উপকারী। প্রদর একটি জটিল মেয়েলি রোগ। প্রদর দু’প্রকার। শ্বেতপ্রদর ও রক্তপ্রদর। উভয় প্রকার প্রদরে ৪/৫টি ডালিম ফুল বেটে মধুর সাথে মিশিয়ে কিছুদিন সেবন করলে রোগ সেরে যায়।

বেদানার যত উপকারিতা

১৮. গর্ভপাত নিরাময়ে

বহু মহিলার গর্ভসঞ্চারের দুই তিন মাসের মধ্যে গর্ভপাত হয়ে যায়। কোনো কোনো মহিলার একাধিকবার এরকম হয়। ডালিম গাছের পাতা বেটে মধু ও দধি একসাথে মিশিয়ে সেবন করলে গর্ভপাতের আশংকা দূর হয়।

১৯. ডালিম গাছের শিকড় ক্রিমিনাশক

ডালিম গাছের মূল বা শিকড় থেকে ছাল নিয়ে চূর্ন করে চুনের পানির সাথে মিশিয়ে সেবন করলে আনায়াসেই ক্রিমিনাশ হয়। বয়স ভেদে ১-৩ গ্রাম পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।

২০. শিশুদের পেটের রোগ নিরাময়ে ডালিম গাছের ছাল

শিশুরা বিভিন্ন প্রকার পেটের পীড়ায় ভোগে। যেসব শিশু পেট বড় হওয়াসহ বিভিন্ন প্রকার পেটের পীড়ায় ভোগে তাদেরকে জন্য ডালিম গাছের শিকড় থেকে ছাল নিয়ে গুঁড়ো করে মধুর সাথে মিশিয়ে সেবন করতে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

২১. ব্রন সমস্যা দূর করতে

বেদেনার খোসা শুকিয়ে সেদ্ধ করে ঠান্ডা হওয়ার পর বেঁটে মুখে মাখলে ব্রন সমস্যা দূর হয়৷

২২. ত্বক উজ্জ্বল রাখতে

বেদেনার খোসা শুকিয়ে তার পাউডার বানিয়ে গোলাপ পানির সাথে মিশিয়ে মুখে মাখলে ত্বক উজ্জ্বল হয়৷

২৩. গলাব্যাথা হলে

বেদানার খোসা থেকে তৈরি পাউডার গরমজলে ফুটিয়ে গারগেল করলে আরাম পাওয়া যায়৷

২৪. মুখের দুর্গন্ধ দূর করে

বেদানার খোসা থেকে তৈরি পাউডার এক গ্লাস পানিতে মিশিয়ে কুলকুচি করলে দাঁতের সমস্যা এবং মুখের দুর্গন্ধের সমস্যা দূর হয়৷

আপনার মন্তব্য লিখুন